Wednesday 21 July 2021

বাঁশি

বিয়োগান্তের সুর হয়ে বাঁশি বেঁচে থাকে তৃষিতার বুকে । বিরহে যে কি সুখ আছে, অপ্রাপ্তিতে যে কি প্রাপ্তি আছে তা যুগ যুগান্তরে রাধারাণীরাই জানেন । বেণীমাধবের বাঁশি যেমন তৃপ্তির আকর হয়ে বেঁচে আছে সৃজনীর মনের মন্দিরে । টলিক্লাবে আজ পন্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়াজির বাঁশির অনুষ্ঠান । অডিটোরিয়ামে তিল ধারণের জায়গা নেই । যাঁরা বসার জায়গা পাননি, সিঁড়িতে বসে বা শেষ সারির পেছনে দাঁড়িয়ে পড়েছেন । সৃজনীও এসেছে তার বান্ধবীদের সাথে । সৃজনী এক বুটিক সংস্থার কর্ণধার । সৃজনীর বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর হলো । দুই ছেলে । বড়ো ক্লাস ৬, ছোট ক্লাস ৪ । স্বামী এক নামি আই টি কোম্পানির উচ্চ পদস্থ কর্মী । সৃজনীর মাস্টার্স পাস করেই বিয়ে । সৃজনীর আর্ট নিয়ে পড়াশোনা । এক সময় গানও গাইতো বেশ ভালো । বিয়ের পর সংসারের চাপ । যা হয় আর কি ! কিন্তু সৃজনী গতানুগতিক গৃহবধূ হয়ে থাকতে চায়নি । চিরকালই খুব কর্মঠ সে । সে গতিশীলা, প্রগতিশীলা । স্কুলে, কলেজে ফেস্ট, রক্তদান শিবির, এক্সিবিশন প্রভৃতি অনেক উদ্যোগে সে অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে এসেছে । দেখতে দেখতে কলেজের সহপাঠিনীদের সাথে শুরু করলো বুটিক । প্রথমে আপত্তি করলেও তার অভিনব হাতের কাজ ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা দেখে শশুর মশাই খুব উৎসাহ দিলেন । প্রথম পুঁজি তিনিই তুলে দেন বৌমার হাতে । সেই থেকে সৃজনীর পথ চলা শুরু । আজ সৃজনীর ডিসাইনার বুটিক বেশ কিছু ভালো স্টোরে পাওয়া যায় । সৃজনী ! সার্থক নামকরণ ! আজ সৃজনী নিজগুণে স্বাবলম্বী । সঙ্গে গরিব বাচ্চাদের জন্যে একটা ট্রাস্টও করেছে সৃজনী । বেশ কয়েকটা বাচ্চার পড়াশোনার ভার বহন করে সেই ট্রাস্ট । সঞ্চালকের বাঙময় ভূমিকার পর দর্শকদের করতালিতে শুরু হলো অনুষ্ঠান । রাগ ইমন, লালিত, তারপর হংসধ্বনি । মাঝে নিজের সৃষ্ট রাগ চন্দ্রায়ণও বাজালেন পন্ডিতজি । স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছাসে ফেটে পড়লো অডিটোরিয়াম । সঙ্গতে এক তরুণ বংশীবাদক ছিলেন । অনুষ্ঠানের মধ্য লগ্নে পণ্ডিতজি তাকে একটা একক বাজাতে অনুরোধ করলেন । সৃজনীর এক সময় বাঁশি খুব পছন্দ ছিল । কিন্তু এক অপ্রিয় ঘটনা তার মনের অজ্ঞাত অলিন্দে এই বাদ্যযন্ত্রটির প্রতি ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলো । তাই সে কিছুতেই আসতে চাইছিলো না আজ । কিন্তু শেষে বান্ধবীদের পীড়াপীড়িতে রাজি হলো । তবে এসে বেশ ভালোই লাগছে সৃজনীর । এমন মনোহারী বাদ্য বোধ হয় কমই আছে । তরুণটি এবার একক শুরু করলো । প্রথমের কয়েকটা নোট স্পর্শ করতেই সৃজনী চমকে উঠলো । একি একি! এতো সেই সুর ! সেই সুর ! সেই মাদকতা ! এ কি করে সম্ভব ! ছেলেটির বাঁশি যেন ব্যাকুল ভাবে কেঁদে উঠছিলো । সৃজনীর মন উত্তাল হয়ে উঠলো । সে চোখ বুজে ফেললো । *** প্রায় ২৩ বছর আগেকার ঘটনা । সৃজনীর তখন বয়স ১৭ কি ১৮ । ক্লাস ১২ এ পড়ে সে । মা বাবার একমাত্র সন্তান । বীরভূমের এক গ্রাম পলশা । দূর্গা পুজোর সময় । সৃজনীর এক দূর সম্পর্কের পিসির বাড়ি পলশায় । দূর সম্পর্কের হয়েও সৃজনীর বাবার খুব আদরের দিদি । সেবার ঠিক হয়েছিল পুজোর সময় সেই গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হবে, গ্রামের পুজো দেখা হবে । সৃজনীর তাতে খুব রাগ হয়েছিল । চিরকালই কলকাতায় বড়ো হয়েছে, এখানকার পুজোর জৌলুশ, বন্ধু বান্ধব ছেড়ে কোন গন্ডগ্রামে যাওয়ার ব্যাপারটা তার একদম মনে ধরেনি । কিন্তু গ্রামে কাশ ফুলের মেলা, ধানক্ষেত, পুকুরে শালুক ফুল, নীল আকাশ, পেঁজা তুলোর মতো মেঘ, রাঙা মাটি দেখে তার মন নেচে উঠেছিল । পিসেমশাই লাবপুর বিডিও অফিসের বড়ো অফিসার । পিসির এক ছেলে এক মেয়ে । মেয়ে ললিতা সৃজনীর সমবয়সী । তার সাথে খুব ভাব হয়ে গেলো সৃজনীর । সেদিন সবাই মিলে সন্ধ্যাবেলায় কৃষ্ণলীলা পালা দেখতে গেলো । ষষ্ঠীর দিন প্রতিবার নাকি গ্রামে যাত্রা পালা হতো । গ্রামে ঢুকতেই একটা পাকা ঠাকুর বাড়ি ছিল, তাতেই গ্রামের সব পুজো হতো । তার পাশে একটা খোলা জায়গায় মাচা বেঁধে তিরপল টাঙিয়ে যাত্রা পালার ব্যবস্থা । মেঝেতেও কাপড় পাতা হয়েছে সবার বসার জন্যে । যদিও শীত পড়েনি, সন্ধ্যে শেষে রাত নামার বেলায় হালকা শিশির পরে । তাই এতো আয়োজন । পালা শুরু হলো । পিসির মেয়ে ললিতা বলেছিলো "কৃষ্ণটাকে যা দেখতে না, চোখ টেরিয়ে যাবে ! আর দেখবি কেমন বাঁশি বাজায় ।" সত্যি তাই । যে কৃষ্ণের ভূমিকায় অভিনয় করছিলো তাকে দেখে সৃজনীর কি যেন একটা হয়েছিল সেদিন । যেন সত্যি কৃষ্ণ । শ্যামলকান্তি, কমল নয়ন, পেলব হাসি আর সে নয়নে, সে হাসিতে কি যেন একটা মায়া । আর তেমনি তার বাঁশি । অভিনয়ের সময় বাঁশি নিজেই বাজালো ছেলেটি । কি তার গভীরতা, কি তার মাদকতা । শুনে সৃজনীর মনে যে কি ঢেউ উঠেছিল তা সেই জানে । পালা শেষে গ্রামসুদ্ধ করতালিতে ফেটে পড়লো । ছেলেটি যেন এক ঝলক সৃজনীর দিকে চাইলো কারণ একমাত্র সেই হাততালি দিচ্ছিলো না । চমক ভেঙে সৃজনী ভীষণ অপ্রস্তুক হয়ে বেতালে হাততালি দিলো । রাতে ভালো ঘুম হলোনা সৃজনীর । সেই মুখ আর সেই ব্যাকুল করা সুর সব সময় তার চেতনা আবিষ্ট করে রইলো । এইভাবে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল জানেনা। হঠাৎ যখন ঘুম ভাঙলো তখন ভোরের আলো ফোটেনি । সৃজনী শুনলো সেই বাঁশির সুর ! সে ধড়মড় করে উঠে বসলো খাটে । পাশে ললিতা ছিল, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন । কোথা থেকে আসছে এই সুর ? নাকি ভুল শুনছে সৃজনী ? সেই মায়াবী সুর যেন বলছে "হ্যাঁ গো, তোমাকেই ডাকছি, শুনতে পাচ্ছো না ?" । দুহাতে সৃজনী কান বন্ধ করে ফেললো । এ যে সহ্য হয়না ! হাত সরিয়ে দেখলো এখনো ব্যাকুল সুরে বেজে চলেছে সেই বাঁশি । তার তনু মন যেন মাদকাসক্ত হয়ে উঠতে লাগলো । আর পারলো না সৃজনী । বাড়ির পেছন দিকে একটা দরজা ছিল, পেছনের মেঠো রাস্তায় খুলতো । বাড়ির কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি । শিকল খুলে বেরিয়ে পড়লো সৃজনী । কোথা থেকে আসছে এই সুর ? বাড়ির পেছনে একটা ছোট মাঠ, তার ঈশান কোণে শিউলি গাছ । তারপর বাঁশবন, তার ওপার থেকে বোধ হয় । ছুটে চললো সৃজনী পাগলের মতো । যেন তার জীবনে আর কোনো উদ্দেশ্য নেই । ঘাসের ওপর শেষ রাতের শিশির, তাতে খালি পায়ের পাতা ভিজে গেলো সৃজনীর । সদ্য ঝরা শিউলি পায়ে দলে, তাদের সুবাস পায়ে মেখে ছুটে চললো সে । বাঁশ বনে মাথা উঁচু করে থাকা গাছের ছায়াঘেরা পথে ছুটে চললো সৃজনী । আকাশে তখনও ম্লান চাঁদ । পৃথিবী যেন অধীর আগ্রহে সূর্যোদয়ের অপেক্ষা করছে । বন পেরিয়ে সৃজনী একটা ফাঁকা জায়গায় এসে পড়লো । আশে পাশে কাশফুল হয়ে আছে অগুণতি । আর একটু এগোলেই পুকুর দেখা যাবে । এখানেই গ্রামের মেয়েরা, বাড়ির বৌয়েরা স্নান করতে আসে, বাসন মাজতে আসে । সুখ দুঃখের কথা বলে । তার পাড়েই এক অশ্বত্থ গাছ । তার নিচ থেকেই আসছে এই সর্বনাশী সুর । দৌড়াতে দৌড়াতে এবার আধ ফোটা আলোয় দেখতে পেলো সৃজনী । তার দিকে পীঠ করে বসে আছে এক দীর্ঘাঙ্গী বলিষ্ট পুরুষ মূর্তি । তার হাতের বাঁশি এই নৈসর্গিক মায়া সৃষ্টি করে চলেছে । অশ্বত্থের বিশ হাতের মধ্যেই এক ছোট পেয়ারা গাছ । তার গা ধরে দাঁড়ালো সৃজনী । এই সুর তাকে পাগল করে দিচ্ছিলো । তার স্রষ্টা তার বিশ হাতের মধ্যেই । কার টানে এসেছে সৃজনী -- স্রষ্টার না সৃষ্টির ? এরা কি আলাদা ? ঈশ্বর আর তার সৃষ্ট জগৎ কি আলাদা ? এই জগতেই তো তাঁর বাস । কখন এক পা এক পা করে সৃজনী এগিয়ে গেছে তা সে টের পায়নি । খালি পায়ে বেরিয়ে এসেছে বাড়ি থেকে । হঠাৎ পায়ে কি একটা ফুটলো । "উঃ" শব্দ বেরিয়ে এলো তার মুখ থেকে । বাঁশি থেমে গেলো । বাদক ঘুরে তাকালো । তখনি ভোরের প্রথম আলো ফুটলো । সেই আলোয় দেখলো সৃজনী । সেই চোখ । সেই পেলব মুখ । সেই মায়া । সৃজনী স্বপ্নহতের মতো চেয়ে রইলো । কোথা থেকে নাম না জানা পাখি ডেকে উঠলো । মোরগ ডেকে উঠলো । ২-৩ টে গরুর সমবেত স্বর । কুকুরের ডাক । এই জীবন্ত দুর্বাদল শ্যাম মূর্তি তার দশ হাতের মধ্যেই । তার দিকে চেয়ে আছে, প্রথমে অবাক হয়েছিল, কিন্তু এবার তার মুখে মধুর হাসি ফুটেছে । এবার মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলো সৃজনী । এই বারে যেন তার ঘোর কাটলো । হঠাৎ ভীষণ ভয় পেলো, সঙ্গে এক রাশ লজ্জা । তার মুখ আরক্ত হয়ে গেছে, ঊষা লগ্নের আকাশের মতোই । আর কিছুতেই এগোতে পারলো না সে । দৌড়ে বাঁশ বন পেরিয়ে, ফিরে গেলো সে । খোলা পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে শেকল তুলে দিলো । কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকলো । তার বুকে যেন দুরমুশ বাজছে । না, তখনও এদিকে কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি । ধীরে ধীরে সে ললিতার পাশে শুয়ে পড়লো । সে তখনও ঘুমে আচ্ছন্ন । সপ্তমী । সারাদিন হই হুল্লোড় করে কাটলো । সকালে স্নান করে ললিতার সাথে পুজোর জোগাড়ে লেগে পড়লো সৃজনী । গ্রামের পুজো । কোনো বাইরের আড়ম্বর নেই । জোগাড়যন্ত্র সব গ্রামের লোকেরাই করে । পুরোহিতও এই গ্রামের মানুষ । ঢাকিরাও । যেন একটা আত্মিক টান অনুভাব করলো সৃজনী । এমন ভাবে পুজো উপভোগ করেনি সে কোনোদিন । এ যেন তার বাড়ির পুজো । তারই পুজো । পাড়ার মহিলাদের কথা কানে এলো সৃজনীর 'কে বাঁশি বাজাচ্ছিল বলতো আজ ভোরে?' 'কে আবার? ওই বাগদি পাড়ার ছেলেটা গো, যে কেষ্ট সেজেছিল, নকা না লকা, কি জানি নাম । পুজোর সময় গেরামে এসেছে । কীর্তনের দল, যাত্রার দলের সাথে তো এগেরাম সেগেরাম ঘুরে বেড়ায় । বাড়ি এলে ভোর বেলায় বাঁশি বজায় । ঢং যত সব ।' 'কি মিঠে সুর গো। আর কেমন শ্যাম শ্যাম চেহারা ' 'শ্যাম না ছাই ! লক্ষীছাড়া, বাউন্ডুলে !!' সৃজনীর অভিসারের কথা কেউ জানল না । কিন্তু সেই বংশীবাদককে সারাদিন কোথাও দেখতে পেলো না সে । তবে জানলো ছেলেটির ভালো নাম বেণীমাধব । বাগদি পাড়ায় বাড়ি । সূর্যালোকে সেদিকে যাওয়া শোভন হবে না । পরের দিন খুব সকালে সন্ধি পুজো । সবাই আমোদ আহ্লাদ করতে করতে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লো । মনে উচাটন নিয়ে শুয়ে পড়লো সৃজনীও । আবার ঘুম ভাঙলো সেই বাঁশির ডাকে! কাক ভোর । সৃজনী এবার আর নিজেকে আটকাবার চেষ্টা করলো না । কারণ সে জানে সেই দুর্নিবার টান উপেক্ষা করার ক্ষমতা তার নেই । পেছনের দরজা খুলে ছুটে বেরিয়ে পড়লো । এবার সে জানে কোথায় গেলে পাওয়া যাবে তাকে । মাঠ, শিউলিতলা, বাঁশবন, কাশ বন, পেয়ারা গাছ, অশ্বত্থ গাছ । বাঁশি বেজে চলেছে । কখন সৃজনী তার ঠিক পেছনে গিয়ে বসেছে সে জানেনা । সৃজনী আর নিজের বশে নেই । তার হৃদপিন্ড দুর্দম বেগে ধাবমান । আগুনের স্ফুলিঙ্গ সঞ্চার করা হাপরের মতো জোরে জোরে তার নিঃশ্বাস পড়ছে । বাঁশি থামলো । ছেলেটি এইবার বুঝতে পেরেছে সৃজনীর উপস্থিতি । সে ফিরে দেখতে না দেখতেই সৃজনী তাকে জড়িয়ে ধরলো সবেগে । সৃজনী আর কিছুতেই ঠিক রাখতে পারছে না নিজেকে । হঠাৎ অস্ফুট চিৎকার আর 'ঝম' শব্দে যুগলের আচ্ছন্নতা কাটলো । দুজনে সেদিকে দেখলো । মুখে হাত দিয়ে এক মহিলা । চোখে মুখে আতঙ্কিত বিস্ময় । পুকুরে বাসন মাজতে এসেছিলেন । হাত থেকে বাসন পড়ে গেছে । হল ভাঙা হাততালিতে বর্তমানে ফিরে এলো সৃজনী । তরুণ ছেলেটি কি বাজানোটাই না বাজালো । সবাই ধন্য ধন্য করতে লাগলো । যেমন সুর তেমন মিষ্টতা । তেমন আকুতি । ছেলেটির গায়ের রং ঈষৎ কৃষ্ণবর্ণ, মাঝারি গড়ন, উজ্জ্বল মুখশ্রী । প্রথম সারিতে, ছেলেটির সামনেই বসে ছিল সৃজনী । এতক্ষণে ছেলেটিকে চিনতে পেরেছে সে । *** বীরভূমের ঘটনার পর অনেক বছর কেটে গেছে তখন । সৃজনী তখন কলেজে পড়ে, ফাইনাল ইয়ার । শীতের ছুটিতে বন্ধুরা মিলে মুর্শিদাবাদ বেড়াতে গেছে । হাজার দুয়ারী দেখে একটা গেস্ট হাউসে উঠেছে । ভেতরে মোবাইলের টাওয়ার পাচ্ছে না বলে বাইরে এসে কথা বলবে এমন সময় শুনলো বাঁশি ! সেই সুর ! এক নিমেষে ব্যাকুল করে দিলো সৃজনীকে । পাগলের মতো সুর লক্ষ্য করে ছুটে চললো সৃজনী । কিছুটা যেতেই দেখলো একটা মাইল ফলকের ওপর বসে ১০-১২ বছরের একটা ছেলে বাজাচ্ছে । অবিকল সেই সুর, কিন্তু অপটু ! সৃজনী কাছে যেতেই ছেলেটি বাঁশি থামিয়ে সৃজনীর দিকে চাইলো । বেশ উজ্জ্বল চেহারা ছেলেটির । ঈষৎ কৃষ্ণবর্ণ । সৃজনী ব্যগ্র হয়ে ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলো "কে শেখালো তোমায় এই সুর ?" ছেলেটি খানিক অপ্রস্তুক হয়ে তাকালো, তারপর বললো "আমার গুরুজী " সৃজনীর ভেতর তোলপাড় করতে শুরু করেছে, বললো "তাঁর কাছে নিয়ে যেতে পারো আমায়? এক্ষুনি! " ছেলেটি অবাক হলো । তারপর রাজি হলো । পড়ন্ত বিকেল । শীত পড়েছে । শীতে এদিকে পাড়া নিঝুম হতে থাকে সন্ধে নামলেই । সেদিকে সৃজনীর একটুও খেয়াল নেই । সে উদ্ভ্রান্তের মতো চলেছে ছেলেটির পিছু পিছু । ঠিক যেন দিশেহারা নাবিক রাতের অন্ধকারে দ্বীপের সন্ধান করে সুদূরের বাতিঘরের আলোকে । কয়েকটা বাঁক নিয়ে, গলি পেরিয়ে অনেকটা হাঁটার পর একটা পাকা বাড়িতে নিয়ে গেলো ছেলেটি । ছেলেটি "গুরুজী" বলে বার কয়েক ডাকতেই এক মাঝ বয়স্ক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন । ফর্সা । ছোট খাটো চেহারা । সৃজনী হয়তো অন্য কাউকে দেখবে আশা করেছিল । দপ করে যেন নিভে গেলো সে । বিমূঢ়তা কাটিয়ে সুরের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেই বললেন ভদ্রলোক "দিদিমনি এ তো প্রচলিত সুর। কৃষ্ণ বন্দনার সুর । বীরভূম,মুর্শিদাবাদ, মালদায় কীর্তনিয়ারা বাজিয়ে থাকেন । কিন্তু কেন বলুন তো ?" সৃজনী গহীন নৈরাশ্য আড়াল করে বললো "না আসলে খুব ভালো লাগলো, তাই জানতে ইচ্ছে হলো । ছোটবেলায় আমার পরিচিত একজন বাজাতেন তাই ভাবলাম .." চুপ করে গেলো সৃজনী । তারপর ভদ্রলোককে নমস্কার করে ছেলেটিকে বললো "আমায় গেস্ট হাউস পৌঁছে দেবে ভাই ? আমি তো এখানে পথ ঘাট ভালো চিনিনা । ঠিক ঠাক ফিরে যেতে পারবো কিনা বুঝতে পারছিনা ।" ছেলেটি ভারী মিশুকে । নাম দুর্লভ । সৃজনী একটা দোকান থেকে ক্যাডবেরি কিনে দিলো তাকে । সঙ্গে পার্সটা এনেছিল । ভারী খুশি হয়ে দুর্লভ সৃজনীর সাথে গল্প করতে করতে পথ চলতে লাগলো । গেস্ট হাউসের কাছাকাছি এসে দুর্লভ বললো "আজ একটু পরেই এখানে একটা কীর্তনের পালা বসবে, যাবে নাকি দিদিমণি ? শহরে এমনটি পাবে না কিন্তু !" প্রথমে গররাজি হয়ে কি যেন ভেবে শেষে সৃজনী রাজি হলো । দুর্লভ হেসে বললো "আমি এসে নিয়ে যাবো, তৈরী হয়ে থেকো কিন্তু ! " সত্যি অসাধারণ পালা । সৃজনীর সঙ্গে কয়েকজন বন্ধুও এসেছিলো । সবার মন ভরে গেলো । কৃষ্ণ ঠাকুরের রাশ লীলাকে সাজিয়ে নতুন রূপ দেয়া হয়েছিল । যেমন গায়কী, তেমন অভিব্যক্তি। সঙ্গে অসাধারণ জোড়া খোলের সঙ্গত । শেষে রাধা কৃষ্ণের মিলন দৃশ্যে হঠাৎ নেপথ্যে বেজে উঠলো বাঁশি ! সেই সুর । সেই পাগল করা সুর । সেই মায়া । সেই ব্যাকুলতা । এক লহমায় সৃজনীর সেই পুরোনো স্মৃতি প্রাঞ্জল হয়ে উঠলো । পলশা । সেই অশ্বত্থ গাছ । সেই বংশীধারী । সৃজনী এই সুরের উৎস খোঁজার চেষ্টা করলো । পারলো না । পেছন দিকটায় একটু আলোআঁধারী ছিল । মনে হলো পেছনে বসে কেউ যেন বাঁশি বাজাচ্ছে । তার মুখ দেখতে পেলো না । পালা শেষে লোকজন বাহবা করতে করে চলে গেলো । অনেকে বংশীবাদকের সাথে দেখা করতে চাইলো । দলপতি বললেন "উনি দেখা করেন না" সৃজনী অনেক কাকতি মিনতি করলো তাঁর সাথে দেখা করবে বলে । শেষে দুর্লভের পরিচিত বলে সে সুযোগ পেলো । একটা কুঁড়ে ঘরের চাতালে একা বসে ছিলেন তিনি । সৃজনী ধীরে ধীরে তাঁর কাছে গেলো । তাঁর মাথা নিচু, চুলের ধারা নেমে এসেছে মুখ বেয়ে । সৃজনী ডাকলে তিনি মুখ তুললেন । সেই মুখ ! কিন্তু একি ! সৃজনী আঁতকে উঠলো । তাঁর একটা চোখ কাপড় দিয়ে বাঁধা, মুখের সেদিকে কুৎসিত পোড়ার দাগ । সেই সপ্রতিভ ভাব আর নেই । সেই রূপ আর নেই । শরীর অনেকটা পড়ে গেছে । সৃজনী মুখে হাত দিয়ে কেঁদে উঠলো "কে করলো তোমার এ অবস্থা ? কে ?" কান্না শুনে দলের লোকজন ছুটে এলো "দিদি ওঁকে দয়া করে আর বিরক্ত করবেন না । ওনার বিশ্রামের সময় হয়েছে । ওনার শরীর ভালো নেই ।' সৃজনী বেরিয়ে পাশের এক আম বনের দিকে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো । কেউ তার কান্না শুনলো কিনা সে জানে না । সে জানে, তার জন্যেই বেণীমাধবের আজ এই অবস্থা ! বন্ধুরা সৃজনীর এমন রূপ কখনও দেখেনি । তাকে ধরাধরি করে গেস্ট হাউসে নিয়ে এলো তারা । কিন্তু সৃজনীর করুন চেহারা দেখে বিশেষ কিছু জানতে চাইলো না । সৃজনী রাতে প্রায় কিছু খেলো না । এক বান্ধবীর সাথে রুম শেয়ার করে ছিলো গেস্ট হাউসে । সৃজনী কোনো কথা না বলে শুয়ে পড়লো ।কিন্তু সারারাত ঘুম হলোনা তার । তার অন্তর ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিলো । সেদিন গ্রামে যেন কত হাজার চোখের বিদ্রুপ ছিছিকারে ভয়ে লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যাচ্ছিলো সে । তাও সে চিৎকার করে বলেছিলো -- "বেণীমাধবের কোনো দোষ নেই, কোনো দোষ নেই ওর ! তোমরা ওর কোনো ক্ষতি করোনা !" পরে শুনেছিলো এই নিয়ে গ্রামে তুমুল গোলমাল হয়েছিল । সৃজনীর বাড়ির লোককে অনেক কথা শুনতে হয়েছিল । কিন্তু পিশেমশাইরা গ্রামের গণ্যমাণ্য ব্যক্তি, উচ্চ বর্ণের সম্ভ্রান্ত পরিবার । তাই শেষে কেউ তেমন দোষ নেয়নি । তবে গরিব, নিচু জাত হওয়া পাপ । তাদের অপরাধ অমার্জনীয় । ভোর আসন্ন । সৃজনীর সাথে যে বান্ধবী শুয়েছিল, সে তখন গভীর নিদ্রামগ্ন । সন্তর্পনে সৃজনী দরজা খুলে বেরিয়ে পড়লো । গেস্ট হাউসে তেমন কড়াকড়ি নেই । মেন গেট খোলাই ছিল । সৃজনী হন হন করে বেরিয়ে গেলো । একটু দূরেই সেই মাইল ফলক যেখানে কাল দুর্লভ বসেছিল । সেখান থেকেই তার গুরুজীর বাড়ি গেছিলো কাল । অন্ধকারে পথ ভালো করে দেখেনি সে । তাও চেষ্টা তো করতেই হবে । কিন্তু কিছুটা গিয়ে আর রাস্তা চিনতে পারলো না সৃজনী । অসহায়ের মতো এদিক ওদিক চাইতে লাগলো সে । কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলো না সে । এই পাপের ভার নিয়ে কি করে বেঁচে থাকবে সে ! এমন সময় দেখলো দুর্লভ ছুটতে ছুটছে আসছে তারই দিকে । কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো "তোমার কাছেই আসছিলাম গো ।" সৃজনীকে একটা কাগজ দিলো "চিঠি। তোমার জন্যে ।" সৃজনী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো "কার চিঠি ?" "মাধব গোঁসাই দিতে বলেন তোমায় । আসলে উনি আমার গুরুজির গুরুভাই । এখানে এলে উনি আমার গুরুজীর বাড়িতেই থাকেন । আমি পাশেই থাকি । আমায় ঘুম থেকে তুলে বললেন তোমায় দিয়ে আসতে ।" সৃজনী অবাক হয়ে কিছুক্ষণ ছেলেটির মুখের দিকে চেয়ে থাকে । তারপর চিঠি হাতে নিয়ে খুলে দেখে লেখা "সেদিন আমাদের একসাথে দেখে গেরামের লোক ক্ষেপে গেছিলো । আমি নিচু জাত, তুমি বামুনের মেয়ে । আমায় লোকে কত মারধোর করলে । হাতে যা পেলো তাই দিয়ে মারলে । একজন জ্বলন্ত ধুনুচি ছুঁড়ে মারলে আমার মুখে । একটা চোখ তাতেই. .। মুখ তো আগেই পুড়েছিল ! কোনো রকমে প্রাণে বাঁচলাম । আর গেরামে ঢোকা হলো নাকো । কিন্তু হয়তো এই ভালো হলো । আমার রূপ রইলো নাকো । কাউকে মজাবার ক্ষেমতাও রইলো নাকো । মনে হয়তো পাপ ছিল, গোবিন্দ হয়তো তারই শাস্তি দিলেন । কিন্তু আমার বাঁশিখানা রইলো, আমার সুর রইলো । মনের মতো গুরু পেলাম । কৃষ্ণ সাধনায় ডুবে গেলাম । এতে যে কি সুখ, কি শান্তি, কি তৃপ্তি কি বলবো তোমায় । তাই তুমি দুঃখ করোনাকো । আমি ভালোই আছি । তুমি ভালো থেকো । মিছে কষ্ট পেওনাকো । আর আমায় ভুলে যেও । " শেষ কথাগুলো যেন শেলের মতো বিঁধলো সৃজনীর বুকে । আজ মনে মনে অনেক সংকল্প করে বেরিয়েছিল, চিঠি পড়ে তার মনোরথ থমকে গেলো । নাঃ ! বেণীমাধব তার জন্যে অনেক কষ্ট পেয়েছে । তার শান্তির পথে আর কাঁটা হবে না সৃজনী । ভোরের প্রথম আলো ফুটলো, সৃজনী যেন চোখে মুখে তার মৃদু উষ্ণতা পেলো । সৃজনীর চোখে জল । কিন্তু তাতে শুধু ব্যাথা, শুধু অপরাধ-বোধ নয় । এক প্রশান্ত উপলব্ধিতে যেন পবিত্র হয়ে উঠলো সে । সৃজনী পার্স হাতড়ে কিছু টাকা দুর্লভের হাতে দিলো, বললো "পুজোয়, একটা ভালো. ..ভালো বাঁশি কিনো, কেমন ? " *** রম রম করে অনুষ্ঠান শেষ হলো । শেষের দিকে চেনা গানের কিছু সুর বাজালেন পণ্ডিতজি ও সহশিল্পীবৃন্দ । তাঁর উৎসাহে পুরো অডিটোরিয়াম সেই গান বাঁশির সুরে সুরে গেয়ে উঠলো । অনুষ্ঠান শেষে সৃজনী অনেক অনুরোধ করে বংশীবাদক ছেলেটির সাথে দেখা করার সুযোগ পেলো । দুর্লভ চিনতে পারলো সৃজনীকে "দিদিমণি, তুমি ! কতদিন পর। " সৃজনী তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো "কত বড়ো হয়ে গেছো ! আর কি ভালো বাজাতে শিখেছো !" দুর্লভ মৃদু হেসে মাথা নিচু করলো, বললো "মাধব গোঁসাই তো আর নেই গো। ....তোমার সাথে সেই দেখা হওয়ার পরদিনই, একা একা বেড়াতে বেরিয়েছিলেন । আমি সঙ্গে যেতাম, সেদিন যেতে দেরি হয়েছিল । তিনি কাউকে কিছু না বলে একাই বেরিয়েছিলেন, সন্ধ্যে হয়ে এসেছিলো । পাকা রাস্তা পেরোতে গিয়ে, ট্রাকের ধাক্কায় ...।" শুনে সৃজনী চুপ করে গেলো । দিনে দিনে যে তুষাগ্নি ধিকি ধিকি তার মনে জ্বলছে, তা যেন তার সারা অঙ্গ জ্বালিয়ে দেবে এইবার । এই জ্বালা ভুলতেই তো সব সময় কাজে ব্যস্ত রাখে নিজেকে । পিছিয়ে থাকা মানুষদের পাশে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করে সে । এই ভাবেই সে প্রায়শ্চিত্ত করে এসেছে এ কবছর । দুর্লভ বলে চললো "শেষ সময় তোমার কথা বলছিলেন জানো । আর যাওয়ার সময় আমায় তাঁর বাঁশিখানি দিয়ে গেছেন । আর এই সুর উনিই আমার গুরুজীকে শিখিয়েছিলেন ।" বলে দুর্লভ তার ব্যাগ থেকে একটা পুরোনো বাঁশি বের করলো, বললো "আমার সাথে রাখি সব সময় । মনে হয় যেন উনি আমার সাথে আছেন ।" সেই বাঁশি বুকে আঁকড়ে ধরে কেঁদে ফেললো সৃজনী । দু চোখ বেয়ে অবিরাম ধারা । তার সঙ্গিনীরা অনেক খুঁজে এসে দেখে অবাক । তারা কেউ কিছু বুঝলো না । বিয়োগান্তের সুখ হয়ে সেই বাঁশি সৃজনীর অন্তর আলো করে দিলো । -- কৃপা

পথে হয়েছিল দেরি

তখন আমার ২১ বছর বোধহয় (তোমার কত জানিনা, কারণ তোমাকে তখনও চিনিনা) । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি । বাড়ি থেকে রোজ সকালে (শনি-রবি বাদে) দু গ্রাস নাকে মুখে গুঁজে সকাল ৮:৩০ নাগাদ ছুটতে হতো নতুন রাস্তা বাস স্ট্যান্ডে বাস ধরবো বলে । বাস আর বাঁশ শব্দের পার্থক্য এতই সুক্ষ যে অনেক সময় তা ধরা যায়না, তখন সে ব্যাপারে সম্যক জ্ঞান হয় । বৃষ্টির দিন । তার মানেই বাস কম । চোখের সামনে দিয়ে একটা বেরিয়ে গেল, ওঠা গেলো না । কারণ তার দরজায় অগণিত যাত্রী ঝুলছেন, ভেতরের অবস্থা আর বললাম না । আমার অবশ্য ভেতরের খবরে আগ্রহ ছিল না । আমি চিরকালই নির্বিবাদী বনবাসী পাণ্ডবদের মতো স্বল্পেই খুশি । বাসের প্রথম পা-দানিতে একটা পা আর কোনো রকমে ঝোলার জন্যে দুটো ধরার জায়গা হলেই আমি খুশি । পরের বাসেও ভাগ্যে শিকে ছিঁড়লো না । তৃতীয় বাসে উঠতেই হবে নাহলে AK স্যারের ক্লাসে ঢুকতে দেরি হয়ে যাবে, আর পরে ওনাকে অনেক জবাবদিহি করতে হবে, সে এক বিভীষিকাময় ব্যাপার !! তাই "জয় মা" বলে পরের বাসে ঝুলে পড়লাম । এক পা নিচ থেকে প্রথম পাদানিতে, একটা হাত বাম রডে, দ্বিতীয় হাত যেখানে সুবিধা সেখানে । এই ভাবে চলতো জীবন সংগ্রাম প্রতি প্যাসেন্জারের ওঠা-নামার সময়, বাসের ব্রেক কষার সময়, বাম্পার ইত্যাদিতে । পাশ দিয়ে হুশ হাশ করে গাড়ি বাইক বেরিয়ে যাচ্ছে । ভগ ভগ করে কালো ধোঁয়া তখন অঙ্গের বসন, পোঁ পাঁ হর্ণের শব্দ কানের অলংকার । প্রায় দেখা যেত আমি আর কন্ডাকটর একই পাদানিতে । বাস একটু থামলে জানলা থেকে এক সহৃদয় ভদ্রমহিলা বললেন "তোমার ব্যাগটা ধরবো ভাই?"। বলাই হয়নি পিঠে একটা গোদা ব্যাগ থাকত, তাতে ক্লাস নোটের বহুমূল্যবান খাতা, টিফিন বাক্স আরও কত কি । উটের কুঁজের মতো তা আমার প্রায় শরীরের অংশ হয়ে যেতো এই সংগ্রামের সময় । আমি রাজি হওয়ার সাথে সাথেই আমার পীঠ থেকে থেকে কয়েক হাত হয়ে ব্যাগ পৌঁছে গেলো সেই মমতাময়ীর কোলে । হঠাৎ ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হলো । হাওয়া দিলে বৃষ্টি বাঁক খেয়ে আমার চোখে মুখে এসে পড়তো পাহাড়ি ঝর্ণার মতো। বাস যখন দ্বিতীয় হুগলি ব্রিজে উঠতো গঙ্গার হাওয়া ভেজা চোখে মুখে মোয়ালেম আদর বুলিয়ে যেত । চোখ বুজে আসতো । তখন আমি পাদানিতে । কিন্তু এই মধুর আবেশে নিজেকে টাইটানিকের জ্যাক মনে হতো । যদি দুহাত মেলে দিতে পারতাম পাখির মতো । আর সামনে থাকতো .. আস্তে আস্তে চোখ খুলে দেখলাম কাক-ভেজা রাগত চেহারার কন্ডাকটর "বাস খালি, বাস পুরো খালি, পেছন দিকে এগিয়ে চলুন. ." এর মতো ডাহা মিথ্যে কথাগুলো অম্লান বদনে আউড়ে যাচ্ছে, তখন সুখ কল্পনায় পূর্ণচ্ছেদ পড়লো । ব্রিজ থেকে নেমে পরের স্টপেজে স্থানচ্যুত হতে হলো । কারণ অগণিত প্যাসেঞ্জের বাঁধ ভাঙা ঢেউয়ের মতো নেমে এলো দরজা বেয়ে । কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই দেখা যেত মোটে ১-২ জন নামতেন, বাকিরা আবার হৈ হৈ করে বাসে ওঠার লড়াইয়ে সামিল হতেন । এবারেও তাই হলো । ইতি মধ্যে বাস ছেড়ে দিলো । লড়াইয়ে পিছিয়ে থাকারা প্রাণপণে দৌড়োলেন বাসের পেছনে । আমিও দৌড়লাম ব্যাগের মায়ায় । আমি আবার দরজা বেয়ে ওঠায় সফল হয়ে দেখলাম আমার ব্যাগ ঠিকই রয়েছে, কিন্তু মহিলাটি বদলে গেছেন । রবীন্দ্র সদনে নেমে এবার মেট্রোর লাইন । তখনও স্মার্ট কার্ড করাইনি । শুনছিলাম কয়েকটা মেট্রো স্টেশনের নাম বদলে স্বনামধন্য ব্যক্তিদের নামে হবে । যেমন টালিগঞ্জ নাকি হবে মহানায়ক উত্তম কুমার । ভাবতাম কেউ বলবেন "দুটো মহানায়ক উত্তম কুমার দেবেন তো" ! ইতি মধ্যে আমি টিকিট কাউন্টারে পৌঁছে গেছি । বললাম "একটা রবীন্দ্রনাথ,.. থুড়ি, রবীন্দ্র সরোবর" । রবীন্দ্র সদন মেট্রোয় রবিঠাকুরের কত কবিতা, হাতের লেখা, আঁকা চিত্রায়িত । কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় হলে "ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত", শক্তি চট্টোপাধ্যায় হলে "অবনী বাড়ি আছো" এসব লেখা থাকতো । কিন্তু এর চিত্ররূপ কেমন হতো ভাবছি এমন সময় দেখি মেট্রো এসে গেছে । এই মানুষ-পেষা ভিড়ে তাড়াতাড়ি ওঠার কায়দা রপ্ত না করলে বিপদ । সোজা সুজি ওঠা যাবে না, তাহলেই পিল পিল করে নামা প্যাসেঞ্জেরদের সাথে সামনা সামনি ধাক্কা লাগবে । আবার সবার নামার অপেক্ষা করলেও মেট্রো ছেড়ে দেবে । "ডীস্কো ডান্সার" ছবির মিঠুনদার মতো কোমর বেঁকিয়ে তেরচা হয়ে দরজার প্রান্ত এড়িয়ে উঠে পড়তে হতো । এই সময় মেট্রোয় এমন ভিড় হতো যে কিছু না ধরেই দিব্বি সোজা হয়ে দাঁড়ানো যেত । উঠেই ভাবছিলাম জীবনানন্দ দাসের নামে মেট্রো স্টেশন হলে লোকে টিকিট কাউন্টারে কি বলতো ? "তিনটে জীবনানন্দ দেবেন " ! সত্যি যদি তিনটে জীবনানন্দ দাস থাকতেন তাহলে "বনলতা সেন" কজন থাকতো ? একজনই কি তবে তিন হাজার বছর ধরে পথ হাঁটতেন? নাকি ৩জন আলাদা আলাদা করে হাজার বছর করে পথ হাঁটতেন । হেঁটে এসে দেখতেন কফি কাউসের টেবিলে বসে আছেন মিস সেন । পথিক বলতেন "সরি ম্যাডাম, আপনার ডায়লগ ছিল না ? ... 'এতদিন কোথায় ছিলেন?' " তিনি বলতেন "এই যে একটু আগেই বললাম, আবার বলতে হবে ?...আপনি কি আবার এক নম্বর ?" "না না আমি তো ২ নম্বর। . আসলে শুরু করতে দেরি করেছিলাম কিনা! তারপর দেখি শ্রাবস্তী বলে আর কিছু নেই । তাই নতুন লোকেশন দেখে আসতে দেরি হলো । আপনি কি ১ নম্বর ?" "হ্যাঁ " "২ নম্বর কই? আমার তো তাঁর সাথেই .." "তার আসতে একটু দেরি হবে। আপনাদের কি ধারণা আমরা আপনাদের জন্যে ঠাঁয় বসেই থাকি। আর কোনো কাজ নেই আমাদের? সেই সক্কাল সক্কাল রান্না বান্না সেরে, এই বৃষ্টিতে অটো মেট্রো ঠেঙিয়ে আসতে হয়েছে, ছাতাটা আবার ছেঁড়া ! চোখের কাজলটাও গেলো ধেবড়ে !" "কি দাদা নামবেন নাকি ?" চমক ভাঙল, দেখি সেই ভীড় মেট্রো । ভাবলাম দাদা নামতে তো হবেই, আজীবন তো মেট্রোয় কাটানো যায়না ! মুখে বললাম "আগে না " "তাহলে সরে দাঁড়ান না, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কেন?" জায়গা ছেড়ে যখন একটা সিটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি দেখি এক কাজল নয়না ড্যাব ড্যাব করে আমার পানেই চেয়ে আছে । মুখে মিটি মিটি হাসি । ভাবলাম, পাখির নীড়ের মতো চোখ ! বাঃ ! .. কিন্তু এ কি ২নম্বর, নাকি ৩?...আমি তাহলে কত নম্বর ?? মেয়েটি কি হাজার বছর ধরে এইভাবেই বসে আছে ? আহা !! ভাবতে ভাবতে দেখলাম পরের স্টেশন এলো । চোখের সামনে মেয়েটি নেমে গেলো । রবীন্দ্র সরোবর । মেয়েটি ফিরে তাকালো কি ? ভিড়ের মধ্যে বুঝতে পারলাম না । যা! দু দণ্ড শান্তি পাওয়া হলো না ! কিন্তু আমি বেশ কোথায় নামতাম ? দারুচিনি দ্বীপ ? নাকি, নাকি রবীন্দ্র সরোবর!! এই রোককে রোককে । কে কার কথা শোনে ! পরের স্টেশন টালিগঞ্জ, তাতেই নামলাম অগত্যা । ভবিষতের মহানায়ক উত্তম কুমার । মনে পড়লো উত্তম বাবুর এক ছবির নাম "পথে হলো দেরি "। -- কৃপা

Friday 26 February 2021

অনুরাগ

সে যখন ভোরের আলো, আমি শিশির সে যখন দুপুরের আঁচ, আমি কৃষ্ণচূড়ার ছায়া । সে যখন সন্ধ্যে হয়ে নামলো নদীর পাড়ে, আমি তখন নদীর কালো জল; সে আমায় মুখ দেখলো, আমি দেখলাম তার চোখের তারা । রাতে সে জ্যোৎস্না, আমি জোনাকির আলো মিলে মিশে একাকার হলাম ।

Tuesday 9 February 2021

দেখা

প্রথম বর্ষার কণা বোজা চোখে পড়তেই যাকে খুঁজিস তুই আমি সেই । রক্ত-গোলাপ হাতে বাসন্তী-রঙা হয়ে যাকে খুঁজিস তুই আমি সেই । পরিযায়ী-ডানায় সহস্র মাইল উড়ে শ্রান্ত হয়ে যাকে খুঁজিস তুই আমি সেই । দুর্ভিক্ষে খিদে-আগুন-পেটে খালি অন্ন-থালায় যাকে খুঁজিস তুই আমি সেই । বাসে ট্রেনে নির্জন গলিতে, বুভুক্ষু চোখের চাহনিতে রক্তাত্ত-বেআব্রু হয়ে যাকে খুঁজিস তুই আমি সেই । আমিও খুঁজেছি তোকে কত কাল ধরে... আমি যেবার জালিয়ানওয়ালা, সেবার তুই হিরোশিমা আমি যেবার কলিঙ্গ, তুই হলি ভিয়েতনাম আমি বার্লিন-ওয়াল, তুই সোমনাথ-মন্দির আমি হোটেল তাজ, তুই চেরনোবিল আমি বসন্ত উৎসব, তুই রোশ-হাশানা আমি ডোডো, তুই টেরোড্যাকটিল । এতদিনে দেখা হলো অবশেষে, টাইম ওয়ার্পের দেশে; এবার তুই অতিমারী, আমিও... হয়তো আবার ছিটকে যাবো গ্রহাণু হয়ে, লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে দুঃখ-বিলাসীদের কবিতা হতে... তাই, বুকে জড়িয়ে নিয়েছি একবার নিবিড় করে এই এক লহমায় হাজার বছর বাঁচবো বলে একসাথে ।

Friday 29 January 2021

The Ventriloquist

Ventriloquism is an enthralling artform. The way a crafty ventriloquist puts life into a puppet -- it fills me with awe and ecstacy. It is just like the act of divinity. It has fascinated me from my childhood days. Today, on the new year's evening, I am dazzled again in the special celebration at the Tolly Club when Niraj -- a ventriloquist and his puppet Boltu are weaving magic on the stage. Boltu is dressed like a baby. They are having a lively conversation. Boltu speaks 'A for apple…’ Niraj says ‘Good! next?…’ ‘B for Blackberry..C for Celkon..' Niraj looks shocked and looking at Boltu says 'C for what?.... Be a baby..you are a baby remember' Boltu pauses and starts singing frantically 'baby doll mein sone di....baby doll mein sone di..' The children in the audience break into peals of laughter. Boltu stops and says 'Do you know why they say, “An apple a day keeps the doctor away” ? ' 'Yes, can't pay a doctor if you take 1 apple phone every day..' (Niraj laughs) 'no.......no...what a bad joke!..' 'So?' 'Last time I hit the doctor with an apple, he fled and never came back' (Boltu starts laughing frantically) Boltu continues, 'there was an egg on his swelling head..egghead......E for egghead, F for furious, G for grumpy...' There were cheering and laughter in the audience. The show ended with a sense of satiety for the audience. There are more to come. Niraj and his puppet Boltu have always entertained me to the brim. In the recess, I reminisced about another show by Niraj a couple of months back organized by our office. It was another evening. I joined after office hours. Many colleagues had their family members with them. The puppet was dressed in suits, so was Niraj. The puppet started 'Well what an audience!' Niraj said 'Yes...What are they looking at?' 'You, idiot!' 'Me?' 'Yes..to check if your lips are moving' .... (the puppet laughed out loud, the audience cheered) The puppet continued 'Who is your favourite cricketer?' 'Sachin..yours?' 'Dada’' 'Why?' ‘Remember what Dravid said? On the offside, after God there is..’ ‘Dada’ (The crowd joins the cheer on Niraj’s gesture) ‘Who is the Lord of Lords?’ ‘Dada’ ‘Who has the highest score by an Indian in the World Cup?’ ‘Dada...Yeah! Let’s cheer for him’ The puppet starts shouting ‘...KORBO LORBO JITBO RE…KORBO LORBO RE JITBO RE..JITBO RE...’ (confused smiles in the audience) Niraj scoffs and says ‘Not that one!’ ‘Sahara pranaam…’ ‘What’s that?’ ‘Theme of Pune Warriors….’(Niraj frowns) ‘..OK..OK...DADAAA…DADA..DADAAA DADA....’ (both look at the audience) Gradually the whole audience joins. Our office had numerous Dada fans. So they joined spontaneously with great zeal. Eventually, the whole auditorium was resonating with the chants of ‘DADAAA DADA...’. The show was of the highest quality. The unbelievable chemistry of the ventriloquist and the puppet captivated everyone. They would quarrel, argue, play games, play antakshari and also interact with the audience effortlessly. The ventriloquist’s lip movement was non-existent which made everyone marvel at his fabulous skill. I felt that the children actually thought that the puppet was living. They had no idea what a monumental shock was awaiting them. After the show ended I went backstage as the toilet was there. There were some more people in the open green lawn just next to the exit, close to the toilet. I saw Niraj’s puppet on a chair. Niraj was not around. Possibly he had also come for the toilet. I was looking at the puppet enchanted. I was wondering what brilliant feats human beings are capable of. It was hard to believe that the puppet was merely a lifeless object and it was only the dexterity of Niraj that pumped life and vitality into it. When I was a child I made crazy wishes. I wished if I could fly, if I could make the trees dance at my tunes and what not! In my childish whim, I was contemplating -- If I had the power to put life into the puppet, if it could talk, walk like me -- such crazy ideas shrouded my subconscious mind. Suddenly, to my utter disbelief, I saw the puppet moving! I felt a bit dizzy. A lot of stress had come my way recently. Work load, family issues. Hence I had come for the show -- to have some fresh air. I thought I was hallucinating. I rubbed my eyes. But it moved again! My sense organs woke up in alarm. I pinched myself. I was wide awake. I looked at the incredible scene in utter disbelief. The puppet fell down from the chair, and standing on one leg, with great effort, shouted at the top of its voice -- ‘Save the child! Someone save the child..electric wire, live electric wire…’ My lips had parted in disbelief, my hands were numb, my heart was pumping like a pacing stallion; in nervy stupor I looked in the direction of its gaze. A child, of 4-5 years, was about to touch a wire emitting electric sparks! In the urgency of the moment I ran in that direction. The puppet’s voice had already alerted other people who retrieved the child just at the nick of time! A second’s delay would have been disastrous! The parents were nearby. They embraced the child and wept inconsolably. It took everyone some fleeting moments to absorb the jitters of the unanticipated event. And it was time for another shock. A 440-volt shock! All eyes looked in great astonishment at the moving puppet! It was sitting on the floor, looking down at the floor. Niraj had returned, and realized the gravity of the situation. He was dumbfounded! The moment of ultimate revelation bemused everyone. These people were also in the audience today. A girl had started to sob in shock.The puppet slowly lifted its eyes and stood up with Niraj’s assistance. There were confused murmurs in the spectators with eyes glued at the remarkable spectacle. The puppet spoke ‘Niraj, remove my mask’ Niraj was frozen. The puppet spoke again ‘Niraj please…’ After mountainous diffidence, Niraj obliged. Off went the mask, exposing a human face! The face of a mature man with the height of a child. A dwarf! The dwarf said ‘I know what you are going through...please give me some time to explain.. Please…’ The spectators could gradually return to their senses. Someone shouted ‘You cheat!...You….’ The dwarf said ‘We will return your money -- the ticket prices...but I beg you...for the child, I could not resist myself, the child was about to….please...give me some time..please, listen to me….’ After much pandemonium and ardent persuasion, people finally agreed to sit on the green turf possibly because the dwarf had saved the child. The dwarf and Niraj sat, facing them. The dwarf narrated his extraordinary tale. ‘My name is Boltu. I was born a dwarf with growth hormone deficiency. I was a little too small. Every time, I faced the rebuking looks. I felt despised. I was an outcast. Everywhere. At school. At social gatherings. The looks minced me. They questioned my existence. Soon, my parents stopped taking me outdoors. My brother was normal. He got all the attention. I felt like a burden. My parents were ashamed of me.’ ‘One day I ran away. After running from pillar to post, I joined a circus. There I met a ventriloquist - Ravi-ji. He was a very generous person. He pitied me and allowed me to stay at his home. I did his household chores. Then I started assisting him in his craft. He was truly magnificent! He worked with two puppets at the same time. While he did it, I could not spot any lip-movement! And his acts were way very witty. I gradually got engrossed in the artform.’ ‘Days passed and I realized I was also very good at it. I practised at my leisure with a needle between my lips with the outer end having a tiny bell that rang if my lips moved. After months of practice, I could do it without the bell ringing! That did ring the bell in me. Maybe I should take it up as a profession!’ ‘Ravi-ji was quite impressed with my skills. He also trained me. I started accompanying him in his shows. Then misfortune befell us. On our way to a show, we had a car accident. Ravi-ji died on the spot. My right hand and right arm got crushed. I was a right-hander. I could barely use my right hand thereafter. My left hand was weak from birth. I could not walk well after the accident. I had the gift of ventriloquism. But I had no physical ability left to practice it with a puppet. Without puppet, it isn't effective. It is widely accepted with the puppet as the primary entertainment factor.’ ‘Then, I met Niraj, a RJ, at the hospital. He had lost his voice in an accident! In the hospital, he was in my adjacent bed. As I came to know about his condition, the idea struck me like lightning! He had an ailing father combating cancer. He needed money. I needed someone to play a puppet!’ ‘I talked to him. Initially he was reluctant. However, on repeated persuasion he agreed to work temporarily with me until he got an alternative. Eventually, we made a great team. Niraj is very skilled and a wonderful actor. We worked on scripts and rehearsed hours to be pitch perfect on stage.’ Boltu -- the speaking puppet -- looked at our eyes and continued 'I am a gifted artist' Surprising us, he started an act, in two alternating voices 'Are you married?' ‘Yes’ 'Have a wife?' ‘What?...' 'Nothing..Is she a housewife?' 'Yeah' 'Does she do the chores?' 'Yes, does all the household...but has a very bad mouth...' 'Tough life, isn’t it??' 'Yeah...she is such a ...' 'C'mon...Can't kill her by all this hard work...' (in a softer tone) 'Let a seasoned maid do it...' 'Do what??' 'Hard work! What did you think??' We were stunned! Not by the humour. We were too thrilled to pay attention to the contents. The first voice was his own (which was the puppet's voice - a little boyish), we could see the wide parting lips. The second voice (Niraj's voice on the show) was coming from somewhere. To our astonishment, we realized, it was coming from Boltu! Without his lips moving at all! The second voice was a bit suppressed though but it was very difficult to believe that it was a 'ventriloquised' voice. It sounded so human, so natural. It seamlessly blended with Niraj’s persona. A man can well speak like this. No one will suspect that the original puppet's voice was a normally spoken voice, and the ventriloquist's voice was the ventriloquised one! Reverse ventriloquism!! Incredible! Brilliant! I have never heard a more natural-sounding ventriloquised voice before -- in no TV shows, not even in the high octane GOT TALENT shows! He quietly said, 'I can emit many different ventriloquised voices' He gave another demo 'One dwarf, two dwarves' 'Three dwarves, four dwarves' 'Five dwarves, Six dwarves' 'Seven dwarves..' 'And snow white!!!' ..spoken in five different ventriloquised voices -- one after another! We were shaken to the core. The five voices were very different. One sounded like a boy, one like a girl, one like a woman, one like a very old man and another like a freak! I could feel that five people were speaking from the same person without almost any lip movement. This guy is a genius! We also came to know that the ‘lips’ of the mask Boltu was wearing were attached to his lips. So, the puppet talked when Boltu talked normally. However, for Niraj’s part Boltu had to use one of his ventriloquised voices without lip movement; otherwise the puppet’s lips would have moved while Niraj was talking -- which would be weird. Importantly, Boltu could have normally spoken two voices (one for the puppet and the other for Niraj) in the secrecy of the mask without using a ventriloquised voice -- that would have been cheating for sure! Instead, Boltu -- in his own unique way -- was brandishing his supreme ventriloquism skills on Niraj, who impeccably synced his lips. Boltu was true to his craft -- there was no cheating whatsoever in this regard. It was pure, untarnished. Boltu had started weeping.. 'I am not a cheater..I am a true artist..the world would have never accepted me, and never will if it knows the truth..I am a dwarf...the cursed one..' There were helpless tears in Niraj's eyes. These spoke a thousand words. I blurted it out in excitement 'But..Why don't you tell the world! Maybe they will be blown away by your unprecedented talent! ' 'We need more money for uncle’s -- Niraj's father's treatment to start...Who knows if the world thinks that we are cheaters..like you may be thinking….that we have cheated them all the time...what if they stop our shows....' Thunderous claps brought me back to the present. Niraj was requested for two performances. One before recess, one at the very end. There were other shows like magic, dance, singing, stand-up comedy etc. But the ventriloquism acts stole the show. The final performance has just started with a huge applause. This time there were two puppets. One was the disguised Boltu, the other one was an actual puppet. I knew who the ventriloquist was, and who were the puppets! Perhaps Ravi-ji would have been proud of this! I was enchanted like ever. More so, after knowing the secret deep engraved in my heart, never to come out. All the audience that day on the lawn -- the privy to the secret -- who were my office colleagues with their family, promised to keep the secret for the sake of the rare talent, for the sake of the duo’s predicament, for the sake of Niraj’s father and above all, for the gratitude that Boltu saved a child's life at the risk of divulging the secret. The treatment of Niraj’s father has started. And, Niraj seems to be happy with Boltu. I don't see them parting ways anytime soon -- for the sake of entertainment that they brought to us, to the children on the new year’s evening.

Sunday 22 November 2020

খোশগল্প

 (১) কাকতালীয়?


ব্যোমকেশ বকশীর নাম শোনেননি এমন বাঙালী বিরল । শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় সৃষ্ট অমর চরিত্র ব্যোমকেশ, যাঁকে প্রথম পাই  'সত্যান্বেষী' গল্পে যা প্রকাশিত হয় সম্ভবত ১৯৩২ সালে ।  কিন্তু জটাধর বকশীর নাম কজন শুনেছেন ? পরশুরাম (রাজশেখর বসু) সৃষ্ট এই চরিত্রের প্রথম আত্মপ্রকাশ সম্ভবত ১৯৫২ সালে । জটাধর এক ঠগ এবং গুলবাজ । অথচ গল্পের গুণে তার প্রতি সম্ভ্রম জন্মানো খুবই স্বাভাবিক । এখানে শরদিন্দু বাবুর অন্য এক চরিত্রের কথা মনে পড়ে -- বরদা, যদিও তাকে ঠগ বলা যায়না, বরং তাকে সুপটু গুলবাজ বলাই ভালো (অনেকটা প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদার মতো) । ভালো কথা, ঠগ ও গুলবাজের পথ্যে একটি পার্থক্য রয়েছে । ঠগের কার্যকলাপ সাধারণত অর্থলাভের মতো বৈষয়িক স্বার্থের  জন্যে ('চাঙ্গায়নী  সুধা' গল্পে জটাধর যা করেছিল)। অন্যদিকে গুলবাজ সাধারণত মিথ্যাচার করে কিছু শ্রোতাদের অলীক অথচ চমকপ্রদ কল্পনায় মজিয়ে তাদের কাছে নিজেকে মাতব্বর প্রমাণ  করার জন্যে ।  জটাধর আর বরদার গল্পে আড্ডার আসর বসতো  চা জলখাবারের দোকানে, মেস ক্লাব বা বাড়ির বৈঠক খানায় (যেমনটা ঘনাদা, তারিণী খুড়োর গল্পেও দেখি )। 

এখানে একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন কি ? দুটো নাম   -- ব্যোমকেশ বকশী এবং জটাধর বকশী । ব্যোমকেশ ও জটাধর দুটিই মহাদেবের নাম ! জটাধরের চরিত্র অনেকটা ব্যোমকেশ স্রষ্টার অন্য এক চরিত্র বরদার মতো । 

না ! পরশুরাম (রাজশেখর বাবু) সৃষ্ট তেমন জবরদস্ত গোয়েন্দা চরিত্র চোখে পরে না । তবে সরলক্ষ হোম নামক এক শখের গোয়েন্দার উল্লেখ মেলে তাঁর এক গল্পে । 'নীলতারা' গল্পে তো স্বয়ং শার্লক হোমসকে হাজির করেছেন !

শরদিন্দু ও রাজশেখর বাবুর ব্যক্তিগত জীবনেও কিছু মিল পাওয়া যায়, যথা 
১) দুজনেই আইন পাস করেন ।
২) বিহার প্রদেশের (মুঙ্গের, পাটনা) সাথে দুজনেরই নিয়মিত যোগাযোগ ছিল ।
৩) শরদিন্দু বাবুর  জন্ম সাল ১৮৯৯ যেবছর রাজশেখর বাবু বি.এ. পাস করেন । 
৪) দুজনেরই জন্ম মার্চ মাসে ।

এছাড়া দুজনেরই অনেক গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র, ধারাবাহিক  হয়েছে । শরদিন্দু বাবু তো বেশ কিছুদিন বোম্বেতে সিনেমার চিত্রনাট্য লেখার কাজ করেন ।

পুনশ্চ: রাজশেখর বাবু ও শরদিন্দু বাবু বাংলা তথা ভারতীয় সাহিত্যের দুই মহীরুহ । আমি দুজনেরই গুণমুগ্ধ ভক্ত । এই অদ্ভুত কাকতালীয় যোগাযোগ দুজনের মধ্যে কিভাবে ঘটলো তা ভাবে কূল পাচ্ছিনা । তাই এই আশ্চর্য observation আপনাদের সাথে ভাগাভাগি করে নিলাম । আর যদি মনে হয় আমি এনাদের তুলনা বা সমালোচনা করছি, তাহলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী । কস্মিনকালেও সেটা আমার উদ্দেশ্য ছিল না । এই ধৃষ্টতা করার যোগ্যতা আমার নেই । এখানে  'great men think alike' এই বিখ্যাত উক্তিটি  হয়তো প্রযোজ্য । এটাও হয়তো বলা যায় 'great men are alike'।  এই যাহঃ ! মহিলারা আবার রাগ করলেন নাকি?

(২) যেমন কাম তেমন নাম 

আমাদের বাড়িতে একজন কিছুদিন মিনারেল ওয়াটার দিতো । তার নাম বরুণ (হিন্দু  মতে জলের দেবতা) । 'অনির্বাণ গ্যাস এজেন্সী' থেকে আমরা ইনডেনের সিলিন্ডার পাই । এজেন্সির ট্যাগলাইন যেন -- "অনির্বাণ শিখা  জ্বলুক ওভেনে ওভেনে" । যাঁরা এদের নাম দিয়েছেন তাঁদের দূরদৃষ্টির তারিফ না করে পারছি না !

এগুলো কাকতালীয় হলেও পদবি পেশার সাথে মিলিয়ে রাখার প্রথা কিন্তু বেশ পুরনো  । সম্ভবত বিশ্বেজুড়ে  ব্রিটিশ শাসনকালে এমন প্রথার প্রচলন ঘটে । পারসী সমাজে 'ওয়ালা' পদবি সম্ভবত ইংরেজ আমলে দেখা যায় ।  যেমন বোতলের  কারবারি হলেন বাটলিওয়ালা , ওষুধের ব্যবসায়ী দারুয়ালা (তখন ওষুধকে 'দারু' বলার প্রচলন ছিল!), টায়ারের ব্যবসায়ী টায়ারওয়ালা, নারকেল ব্যবসায়ী হলেন নারয়েলওয়ালা প্রভৃতি । তাছাড়া 'vakil' (পুণেতে Dr. Vakil নামক দাঁতের ডাক্তারের চেম্বার দেখেছি), ইঞ্জিনিয়ার (ক্রিকেটার ফারুক ইঞ্জিনিয়ার), মুন্সী প্রভৃতি পদবিও রয়েছে । ইংল্যান্ডে স্মিথ (goldsmith, blacksmith প্রভৃতি থেকে) , tailor/taylor,  বেকার, কুক, শেফার্ড, কার্পেন্টার, clark/clarke (clerk থেকে),  বন্ড (দাস), পার্কার (পার্ক-এর দ্বয়িত্বে যিনি),  ওয়ার্নার (warriner থেকে -- warriner হলেন খরগোশ পালক), bailley (bailiff  থেকে -- bailiff হলেন এক ধরণের কর্মচারী), বিশপ, পোপ  প্রভৃতি পদবি দেখা যায়  যা সম্ভবত ব্রিটিশ উপনিবেশের ফলে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে । একই ভাবে জার্মানিতেও এর প্রচলন দেখা যায় । স্মিথ (smith) এর জার্মান সংস্করণ হলো Schimdt, tailor এর হলো Schneider, baker এর becker। এছাড়া  fisherman দের  fischer, shoemaker দের  schumacher, রাজসভাসদদের hoffmann, খনির শ্রমিকদের bergmann প্রভৃতি রয়েছে । ফরাসিদের মধ্যে boucher (কসাই), পেজ (ভৃত্য) প্রভৃতি আছে । ইহুদিদের মধ্যে cohen পদবীর উৎস তাদের পরিবারের পুরোহিত পেশা । ওলন্দাজ পদবি 'de kock' এর অর্থ cook বা রাঁধুনি, 'de Smet' বা 'de Smedt' এর অর্থ smith ।

বাঙালিদের ও বাংলা সংলগ্ন প্রদেশের লোকজনের  মধ্যেও এর চল রয়েছে । যেমন বণিক, সেনাপতি, ঘটক, গায়েন, মাঝি, পাল, মালাকার  প্রভৃতি । 

Ali Al-Khimay নামের অর্থ নাকি "Ali The Chemist" । অর্থাৎ al শব্দ (এখানে যার অর্থ সম্ভবত 'the') পেশার যুক্ত হতে দেখা যায়, যদিও সব ক্ষেত্রে এমনটি হয়না  । শোনা যায় Alchemy শব্দটি এই ভাবেই এসেছে ।

Friday 23 October 2020

স্বপ্ন

 (১)


আমার জন্মের সময়েই মা চলে গেলো বলে আমার নাম 'অপয়া' । যত বড়ো  হয়েছি আরও কত নাম যে কুড়িয়েছি -- বেয়াড়া, বেয়াদব, অকাল কুষ্মান্ড, কুলাঙ্গার -- তার হিসেব নেই । তাই আর আসল নাম নিয়ে মাথা ঘামাই না ।

ছেলেবেলা থেকেই আমি একটু অন্য রকম । আর পাঁচটা 'ভালো ছেলে'-এর মতো নই । একটা ঘর ছিল আমার -- তাতে নিজের খেয়ালের জাল বুনতাম, এলোমেলো, অগোছালো ছন্দে । সেই ঘরের নাম দিয়েছিলাম 'মন' (জানি সেটাকে ওরা বলতো 'উচ্ছন্ন')।  ভালোবেসে বাবা আমায় একটা গিটার দিয়েছিলো । তাতেই গুন্ গুন্ করে সুর ভাঁজতাম  । ওই একটা বিষয়েই মন ছিল আমার । পড়াশোনায় খারাপ ছিলাম না । কিন্তু তাতে তেমন আগ্রহ ছিল না ।
শুনেছি মা নাকি খুব ভালো গান গাইতো । গানের মাস্টার বলেছিলো নাকি আমার হবে । কিন্তু হওয়ার আগেই আমার নতুন মা তাকে বিদেয় করলো । 

বারান্দায় অনেক পাখি আসতো -- মৌটুসী, দোয়েল, বুলবুলি, বেনেবৌ, ময়না, ফিঙ্গে  -- আরও কত কি । আমাদের বাড়িতেই একটা বাগান ছিল কিনা, তাই আসতো তারা । শুধু তারাই বুঝতো আমায়, আমি তাদের । তাদের কিচিমিচিতে গানের কথা  খুঁজে পেতাম । আকাশের দিকে চেয়ে বসে থাকতাম ঘন্টার পর ঘন্টা । সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যে নামতে দেখতাম, সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত । আর দেখতাম মুহুর্মুহু বদলে যাওয়া পৃথিবীটাকে । রামধনুর সাত রঙে সাত সুর খুঁজে পেতাম । রাতে ঘুম ভেঙে গেলে তারাদের মিটিমিটি মর্স কোড ডিক্রিপ্ট করতাম, ব্রম্ভান্ডের কত রহস্য জেনে ফেলতাম চুপিচুপি । জোনাকীর নিয়ন-নৃত্যে  বিভোর হতাম  । ভোরে শিশির ভেজা ফুলে ভ্রমরের সিম্ফনি শুনতাম চোখ বন্ধ করে।


(২)

সেবার গ্রামে দেশের বাড়ির  দূর্গা পুজোয় গেছিলাম । তখন কলেজে পড়ি  । বাতাসে ঢাকের বোল মনে তরঙ্গের  সঞ্চার করছিলো । তবে আমি তেমন মিশুকে নই । তেমন একটা বেরোতাম না । আর কেউ তেমন একটা ডাকতোও না আমায় । ঘর, বারান্দা থেকেই পুজোর আমেজটাকে আত্মস্থ করতাম । 

একদিন চিলেকোঠায় গিটার নিয়ে নতুন গানটা  শেষ করছি । হঠাৎ নূপুরের  মতো সুরেলা কণ্ঠ শুনে ঘোর কাটিয়ে দেখি সে ! কতক্ষণ সে এসে দাঁড়িয়েছে জানিনা । এর আগে তাকে কখনো দেখেছি বলে মনে পড়লো না 
"বাহ্! এটা তো আগে শুনিনি ! তোমার বানানো বুঝি ?" 
বলে সে চুপটি করে বসে পড়লো আমার পাশে । 
"পুরোটা শোনাও না প্লিস !" 

এক লহমায় অচেনার জড়তা চুরমার করে কেউ এমন কাজ করতে পারে দেখে রীতিমতো অবাক হলাম । তারপর কিছুক্ষণ ভেবে প্রথম থেকে গানটা গেয়ে শোনালাম । চোখ বন্ধ করে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলো সে । এমন শ্রোতা এর আগে জোটেনি আমার । তার উপস্থিতি যেন এক মায়াময় সংগীত আবহাওয়া তৈরী করতো আমার মনে । তাই সেদিন তার নাম দিয়েছিলাম 'মায়া' । পরে অবশ্য ভাবতাম সে  'আলেয়া' । তারও পরে বুঝেছিলাম, ভুল করেছিলাম । 

চিলেকোঠা থেকে ওঠা নামার অন্য একটা পথ ছিল ।  ভাঁড়ার ঘর হয়ে । সেই পথে আসতো সে,  সন্ধ্যে হলে ।  এ পথের সন্ধান সে কি করে  জেনেছিলো কে জানে ! আমায় চুপিচুপি নিয়ে চলে যেত গ্রামের প্রান্তে সেই কাশ বনটা পেরিয়ে, সেই শিউলিতলায় । কাছেই একটা পুকুর ছিল । তার পারেও যেতাম মাঝে মাঝে । সঙ্গে নিতাম আমার গিটারটা । আকাশ, চাঁদ, শিউলির সুবাস আর আমার গান । চোখ বুজে শুনতো মায়া ।  

সেই একবারই  কেমন যেন অস্থির হয়েছিল সে । আমায় জড়িয়ে খুব কেঁদেছিলো । বলেছিলো 
"আর বোধ হয় দেখা হবে না ..!!" 
ভারি ছেলেমানুষ সে। ভারি ইমোশনাল, বেহিসেবী হয়ে পড়েছিল সেবার ।    

সেই সন্ধ্যেয় শেষবার দেখেছিলাম তাকে । বলেছিলো "আমায় মনে রেখো .. তোমার গানে গানে" । কাশ, শিউলি সাক্ষি ছিল সেদিন। শুনেছিল আকাশের চাঁদ তারা । পরে জেনেছিলাম তার অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে গেছে । মায়া যেন আলেয়া হয়ে বিলীন হয়ে গেলো আমার জীবন থেকে । নিজেকে যন্ত্রণা দিয়েছিলাম, শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম নিজেকে । হাতের নাড়ি বয়ে প্রাণ বেরিয়ে যেত আর একটু হলেই, বাবা এসে না পড়লে ! সেই ক্ষত এখনো আছে মনে, তার দাগ হাতে । তার নাম দিয়েছি 'স্মৃতি' । যতবার হাতের দিকে দেখতাম কানে বাজতো  "আমায় মনে রেখো .. তোমার গানে গানে " ।

(৩)

কতদিন কেটে গেছে । ৮ বছর ? আজ চতুর্থী । সন্ধেবেলায় একাডেমিতে আমার অনুষ্ঠান । শারদীয়া সংগীতানুষ্ঠান । ফুল হাউস । বেশ জমাটি অনুষ্ঠান হলো । 'জোনাকীর jazz', 'ভ্রমরের সিম্ফনি', 'শিশিরের সুর', 'পলাশের ঘুম' -- এগুলো দুবার করে গাইতে হলো । শ্রোতারা শেষের দিকে গলা মেলালেন । শেষে অগণিত অটোগ্রাফ-সেলফির আবদার । সঙ্গে কয়েকটা বাংলা নিউস চ্যানেলের সাংবাদিকরা । এসব আমার একদম ভালো লাগেনা ।  কিন্তু কি আর করার !

এতো কিছু সেরে  ব্যাক স্টেজে গিয়ে দেখি আলেয়া ! নাকি মায়া? সঙ্গে একটা ফুটফুটে বাচ্চা ছেলে । সেই চেনা কণ্ঠস্বর (একটু ভারী হয়েছে কি ?)
'আমার ছেলে । ও তোমার খুব ভক্ত ।' 
ওর চোখে সেই মায়া তখনো জেগে আছে । 
'ওর নাম রেখেছি স্বপ্ন । ভারী সুন্দর গানের গলা জানো ।'

বলে আমার চোখের দিকে সেই শেষ দিনের মতন করে চেয়ে রইলো সে । মুহূর্তে সেই স্মৃতি  প্রাঞ্জল হয়ে উঠলো । চিলেকোঠা, কাশ, শিউলি, পুজো ...! আমি সব মনে রেখেছি, গানে গানে । যেমনটি সে চেয়েছিলো । এতো গানে -- তাদের সুরে, কথায়, অভিব্যক্তিতে -- তার সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত বেঁচে আছে । সেই ক্ষত আজও জেগে আছে আমার মনে -- অদম্য অনুপ্রেরণার আগুন হয়ে । মায়া যে আলেয়াও সে । সুখের মতোই সে ক্ষণস্থায়ী । তবু তার আবেশ রয়ে যায় আমরণ ।

জানলাম তার স্বামী এ শহরেই চাকরি করে । রাস্তার ধারে হোর্ডিং -এ আমার অনুষ্ঠানের খবর পেয়েছে এসেছে । ভালো বিয়ে হয়েছে তার । কিন্তু আমায় কি ভুলতে পেরেছে সে ? তার নীরব চাহনি যেন হাজার বছরের না বলা ইতিহাস ব্যক্ত করছে । 
ছেলের মাথায় হাত রেখে বললো 
'ওকে শেখাবে? ওর বয়স বয়স ৭।'

কিছুক্ষণ ওর দিকে চাইলাম  অবাক হয়ে । ঠিক যেমন অবাক হয়েছিলাম সেই প্রথম দিন । তারপর ছেলেটির দিকে চাইলাম । তার নিষ্পাপ চোখে কি জানি দেখলাম । স্বপ্ন ? তাই হবে! মুখে তার অনাবীল হাসি । আর সেই মায়া -- যা আমায় জিইয়ে রেখেছে এতদিন !

স্বপ্নকে বুকে জড়িয়ে নিলাম।  এ স্বপ্ন যেন আমারও ।

 'কাশের দেশ', 'শিউলির সাধ', 'মেঘের বিদ্যুৎ' আরও কত কিছু শেখালাম তাকে ।   দেখলাম সেও পাখির ভাষা বোঝে, ভ্রমরের সুর চেনে ।  চেনে রামধনুর রঙে সাত সুর ।  

--

কৃপা 

Saturday 26 September 2020

কোভিডমাঝে অমরাবতী

করোনার দাবানলে বিশ্ব সন্ত্রস্ত। এর আঁচ সমগ্র মানবজাতিকে স্পর্শ করেছে। কেউ নিজে আক্রান্ত, কারো আত্মীয়-পরিজন-বন্ধু। কেউ আক্রমণের ভয়ে সন্ত্রস্ত। আবার কেউ এই দুর্ধর্ষ শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামে ব্রতী। স্বাস্থকর্মী, পুলিশ প্রভৃতি  ঈশ্বরের প্রতিনিধিরা এই দুর্বিনীত মহাশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন মানুষের কল্যাণে, নিজের জীবন বিপন্ন করে । তেমনই চিত্র এক সরকারী হাসপাতালের কোভিড ওয়ার্ডে । পিপিই-বর্ম পরে অসংখ্য ডাক্তার, নার্স স্বাস্থ্যকর্মী ততোধিক রোগীর সেবায় আত্মনিয়োজিত প্রাণ। 


ডঃ রিয়া বসু । এই সরকারী হাসপাতাল থেকেই সম্প্রতি সম্মানের সাথে এম.বি.বি.এস পাস করেছে । ভালো কোনো জায়গা থেকে এম.ডি. করার ইচ্ছে । কিন্তু এই পরিস্থিতি তাতে বাধ সেধেছে । এই কলেজ-হাসপাতালের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভারী প্রিয় রিয়া । তাই কোভিড ওয়ার্ডে এই সংগ্রামের ডাক সে উপেক্ষা করতে পারে নি । তা ছাড়াও আর্তের কষ্টে চিরকালই তার প্রাণ কাঁদে । হয়তো সেই জন্যেই রিয়া ডাক্তারী পড়ার সিদ্ধান্ত নেয় । কৃতী ছাত্রী হওয়ায় সে পথও সুগম হয়েছে ।


এই ওয়ার্ডে কয়েকজন রোগীর ভার পড়েছে রিয়ার ওপর । তাদের মধ্যে অন্যতম স্বপ্নময় মিত্র । দিল্লি আই.আই.টি থেকে পিএইচডি করার পর আমেরিকায় পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ করছিলো । অসামান্য মেধাবী ছাত্র হওয়া ছাড়া স্বপ্নময়ের একটি মহৎ গুণ ছিল । সে ছিল মানব-দরদী । মানুষের বিপদ দেখলেই সে আর স্থির থাকতে পারে না । এবারেও তাই হলো । করোনার আগ্রাসনে বিপন্ন আমেরিকা থেকে ফিরেই সে দেশের মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করলো । তারপর এলো আমফানের বজ্রথাবা । ত্রাণ সংগ্রহ এবং বিতরণের কাজে মজে গেলো স্বপ্নময় । কিন্তু করোনা নির্মম, বিবেকহীন । সাধু-অসাধুর তফাৎ করেনা, রেয়াত করেনা । হঠাৎ প্রচন্ড জ্বর, স্বাস কষ্টের ঢেউ তাকে আছড়ে ফেললো এই কোভিড ওয়ার্ডে ।


রিয়া অবশ্য স্বপ্নময়ের ব্যাপারে কিছুই জানে না । তার কাছে স্বপ্নময় আর একজন রোগী মাত্র । তবুও প্রথমবার স্বপ্নময়ের কষ্টে ম্লান মুখখানি দেখে মায়া হয়েছিল তার । মায়া অবশ্য রিয়ার অসুস্থ মানুষ দেখলেই হয় । কিন্তু এই মায়া বোধ হয় একটু অন্য রকম । কেন ? তা রিয়া বোধ হয় জানে না ।


একদিন স্বপ্নময়ের খুব জ্বর । ঘোরে ভুল বকছে

'মা ... মা ভালো আছে ? মা ..'


স্বপ্নময়ের মা-ই তার একমাত্র আশ্রয় । বেশ কিছুদিন হলো বাবাকে হারিয়েছে সে । মায়ের কোভিড টেস্ট নেগেটিভ । তাও তাঁকে সেলফ ক্যাণ্টিনে রাখা হয়েছে ।


রিয়া তখন স্বপ্নময়ের পাশে, সে বলে


'আপনার মা ভালো আছেন ..আপনি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন ..ওনাকে দেখতে পাবেন '


স্বপ্নময় বলতে থাকে


'তপন ..বাপ্পা .. সুন্দরবনে ফুড প্যাকেট পাঠিয়েছে? ..ব্যাঙ্ক ট্রান্সফার করা হলো না। ...টাকা জোগাড় কি করতে পারবে ওরা ?'


বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়লো স্বপ্নময় । কথাগুলো দাগ কাটলো রিয়ার মনে ।


একমাসের ওপর হলো রিয়া বাড়ি ফেরেনি । সে তার কলিগ ললিতার সাথে হাসপাতালের কাছেই একটা বাড়ি ভাড়া করে থাকছে এ কদিন । রান্না বান্না তারাই কোনোরকমে করে চালাচ্ছে । কোনো কোনোদিন এমার্জেন্সি থাকলে হাসপাতালেই থেকে যেতে হয় । রিয়ার মা নেই, শৈশবেই গত হয়েছেন । বাবা আর বিয়ে করেননি । রিয়ার এক দাদা আছে । রক্তিম । ডাক নাম রুকু । সে লন্ডন-এ সেটলড । বাড়ি থেকে রিয়ার বিয়ের চিন্তা ভাবনা চলছিল । রিয়ার বাবার এক বাল্যবন্ধু অম্লান রায় । মস্ত ব্যবসাদার, কোটিপতি । তাঁর ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে রিয়ার বাবার সাথে কথা বলেছেন তিনি । এক ফ্যামিলি ফাঙ্কশন এ তাঁরা রিয়াকে দেখেন । রিয়া বেশ সুশ্রী। রুচিশিলা । মার্জিত নরম স্বভাব । কারো মুখের ওপর কথা বলতে পারে না । রিয়া তাই প্রথমে আপত্তি করেনি । তবে অম্লান বাবুর এই কথায় সে যেন বিদ্যুস্পৃষ্ট হয়ে পরে --


'আমার এতো ব্যবসা, এতো সম্পত্তি, বাড়ি গাড়ি সবই আমার ছেলে পাবে । একমাত্র ছেলে । বাড়ির বৌ আর অত লেখাপড়া, চাকরি বাকরি করে কি করবে ? ডাক্তারীতে অনেক ঝক্কি ! দিন নেই রাত নেই । রোগীর সবা করো । এটা একটা লাইফ হলো ? আমার বাড়িতে আরামে থাকবে, পায়ের ওপর পা তুলে..হা হা "।


বাল্যবন্ধু বলে রিয়ার বাবাও কিছু বলতে পারেননি । অম্লান বাবুর ছেলেটি ফরওয়ার্ড গোছের । প্রথম দেখার পর ফোন নম্বর চায়, তারপর কফি, সিনেমা ইত্যাদির প্রস্তাব । রিয়া নানা অজুহাতে এড়িয়ে গেছে নরম ভাবেই । কিন্তু ক্রমে রিয়ার দম বন্ধ হয়ে আসছিলো । স্বপ্নময়ের আবির্ভাব তার মনের জানলা আবার খুলে দিয়েছে ।


আর একদিন । স্বপ্নময়কে খুব অস্থির দেখে রিয়া তার কাছে গেলো । তখন স্বপময়ের বেশ জ্বর । অপ্রকৃতস্থ অবস্থা । তাকে দেখেই স্বপ্নময় বলে উঠলো


"দেখুন না ডক্টর এরা আমায় আমার মোবাইলটা দিচ্ছে না । মায়ের খবর পাচ্ছি না । মা নিশ্চই আমার চিন্তায় আহার নিদ্রা ত্যাগ করেছে।.."


বলেই কেশে উঠলো স্বপ্নময় । রিয়া তাকে বললো


"আপনি এতো উত্তেজিত হবেন না দয়া করে । আপনার মা ভালো আছেন । আমরা নিয়মিত খবর দিচ্ছি ওনাকে ।"


"আপনারা বুঝতে পারছেন না । কত লোকের বাড়ি ভেঙে গেছেন জানেন ? কত লোকের কাজ নেই, তারে খাবে কি? সরকারের ত্রাণ পৌঁছাতে পৌঁছাতে সবাই না খেয়ে মরে যাবে । ওরা টাকা জোগাড় করতে পারলো কিনা কে জানে ? এতগুলো অসহায় মানুষ । আর আমি কিনা বেডে শুয়ে আছি !"


বলে আবার কেশে উঠলো । একটু শ্বাসকষ্ট হচ্ছে স্বপ্নময়ের । রিয়া স্বপ্নময়ের পাশে বসলো । স্বপ্নময়ের চোখের চাহনিতে কি একটা ঔজ্জল্য রয়েছে, এই রুগ্ন চেহারাতেও তা স্পষ্ট । যেন অগ্নিশুদ্ধ সোনার মতো । কর্মযোগীর তেজোদীপ্তি যেন । রিয়া বললো


"দেখুন, আপনি যদি সুস্থ না হন তাহলে ওদের জন্যে কিছু করতে পারবেন কি ?"


স্বপ্নময় মাথা নিচু করলো । রিয়া বলে চললো


"আপনি খুব তাড়াতাড়ি সেরে উঠুন । অনেকে আপনার মুখের দিকে চেয়ে আছে ।"

রিয়া জানে অনেকের মধ্যে সেও একজন ।


স্বপ্নময়ের মুখে এবার হাসি ফুটে উঠলো । কি প্রশান্ত, কি পবিত্র সে হাসি যা রিয়ার মনে হাজার পারিজাতের সুবাস ছড়িয়ে দেয় ।


সেদিন রিয়া গিয়ে দেখে স্বপ্নময়ের বেড খালি । গতকালই বেশ অসুস্থ ছিল সে । বুকের ভেতরটা ছাঁত করে উঠলো রিয়ার । রাতের শিফ্টের কাউকে পেলো না । হঠাৎ শুনলো ওয়ার্ড বয় বলছে "বেড নং ৫ এমার্জেন্সিতে। ..অক্সিজেন লাগবে .."। স্বপ্নময়ের বেড নং ৫! তাকে জিজ্ঞেস করতে জানা গেলো হঠাৎ স্বপ্নময়ের অবস্থার অবনতি ঘটেছে । হঠাৎ প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয় রাত ৩টে নাগাদ, অনেক জ্বর । তাকে এমার্জেন্সিতে ভেন্টিলেটর-এ রাখা হয়েছে । সম্প্রতি অনেক করোনা জনিত মৃত্যু দেখেছে রিয়া । বৃদ্ধ, তরুণ অনেকর মৃত্যু । কিন্তু স্বপ্নময়ের এ পরিস্থিতি যেন বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে দিলো রিয়ার । সে ছুটে গেলো এমার্জেন্সিতে । দেখলো স্বপ্নময়ের নাকে-মুখে ভেন্টিলেটর, আরও লাইফ সাপোর্ট । পালস স্টেবল নয়, মাঝে মাঝে সিংক করছে । আর সিনিয়র ডাক্তার এই মুহূর্তে কেউ নেই । রিয়া চোখ বন্ধ করে স্নায়ু শক্ত করে নিলো । সামনে কঠিন যুদ্ধ । এ যুদ্ধ যেন সে নিজের জন্যেই লড়ছে ।


এই ভাবে ৫০ ঘন্টা কাটলো । রিয়া এমার্জেন্সি থেকে নড়েনি । অভিজ্ঞ ডাক্তার পরের দিকে এসেছিলেন । কিন্তু রিয়া তার আহৃত সমস্ত ডাক্তারি বিদ্যা উজাড় করে দিয়েছে । রিয়া খুবই মেধাবী ছাত্রী ছিল । সেই কারণেই সে তার ডাক্তার শিক্ষক শিক্ষিকাদের এতো প্রিয় । আজ তার শিক্ষা সার্থক । স্বপ্নময় চোখ খুলেছে । জ্বর নেই । মুখে সেই স্বপ্নময় হাসি ।


আজ স্বপ্নময় অনেকটাই সুস্থ । ১৫ দিন হয়ে গেলো । এবার তাকে তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেওয়া হবে । রিয়া আজ আবার স্বপ্নময়কে দেখতে গেছে । স্বপ্নময়ের মুখে সেই হাসি ফুটে আছে । সে রিয়াকে বলে


"ড: বসু কি বলে যে আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাবো! "


পিপিই -তে মানুষ চেনা যায়না । রিয়ার বুকের কাছে তার আই ডি কার্ড ছিল । তাই দেখেই স্বপ্নময় তাকে চিনেছে ।


"..আমি শুনলাম আপনি আমায় যমের  হাত থেকে বাঁচিয়ে এনেছেন। ..আপনার কাছে আমি চিরঋণী হয়ে গেলাম .."


রিয়ার মনে আজ হাজার পারিজাত ফুটে উঠেছে স্বপ্নময়কে সুস্থ পেয়ে, তার স্বপ্নময় হাসিতে । তার মনের ভাব হয়তো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তার ডাগর চোখে, সুশ্রী মুখে ফুটে উঠতো । কিন্তু পিপিই ভেদ করে তা অবলোকন করা স্বপ্নময়ের সাধ্য নয় । মনের ভাব গোপন করার আপ্রাণ চেষ্টা করে রিয়া বলে


"এ কি বলছেন ছি ছি । এতো আমাদের ডিউটি ।"


"ডিউটি আজকাল এতো নিপুণ ভাবে কজন পালন করে বলুন! তার জন্যে একটা একাগ্র মন থাকা চাই, নিষ্ঠা থাকা চাই । "


বলে স্বপ্নময়ের হাসি দ্বিগুণ হয়ে ওঠে ।


রিয়া ভাবে, ও কি তার মনের কথা বুঝে গেলো ? তারপরই মনে হলো কাল যদি ওকে ছেড়ে দেয় , যোগাযোগ হবে কি ভাবে ? যদি না হয় ? তাহলে কি করবে রিয়া ? কন্টাক্ট নাম্বার চাইবে ? কিন্তু সেটা কি করে চাইবে সে ? না না ! তা কিছুতেই পারবে না রিয়া ! রিয়ার নীরবতা ভেঙে স্বপ্নময় বলে

"সুন্দরবনে অনেক লোক খাবার জল, চাল, ডাল পেয়েছে জানেন । আমি কিছু টাকা ট্রান্সফার করলাম । আপনারা আমায় আমার ফোন ব্যবহার করতে দিয়েছেন বলে অনেক ধন্যবাদ । আরো অনেকে এগিয়ে এসেছে । এতদিনে সরকারের ত্রাণও এসেছে ।"


রিয়া কিছু না ভেবেই যেন বলে ফেললো


"আমার পরিচিত যদি কেউ ডোনেট করতে চান. . মানে করোনা বা এই ধরণের কাজে ..তাহলে?...আমি কি আপনাকে বলতে পারি ?"


স্বপ্নময় যেন আনন্দে লাফিয়ে উঠলো ! বললো


"বাঃ সে তো বেশ ভালো কথা ! আপনি আমার সাথে যোগাযোগ করুন । আপনার হোয়াটস্যাপ নম্বর বলুন ।"


রিয়া বলে । সঙ্গে তার মনের জানলা থেকে পারিজাতের সুবাস এসে তার মনটা ভরিয়ে দিলো ।


কিছুদিন কাটে । রিয়ার ধকল আরও বাড়ে । স্বপ্নময়ের সাথে আর যোগাযোগের সুযোগ হয়না । একদিন রাতে ঘরে ফিরে দেখে স্বপ্নময় হোয়াটসআপ করেছে


"সরি আপনার নম্বর তা সেদিন সেভ করলাম, কিন্তু আপনার সাথে যোগাযোগ করিনি । আজ মা সেদিনের ঘটনার কথা জেনে আপনাকে অনেক আশীর্বাদ জানাতে বললো । তাই জানালাম :-) ভালো আছেন তো ?"


রিয়ার সব ক্লান্তি নিমেষে মুছে গেলো, লিখলো


"আপনি ভালো আছেন তো ? এখন আর বেরোবেন না যেন। "


":-) সে দেখা যাবে"


"দেখা যাবে মানে? আবার অসুস্থ হলে ?"


"আপনি রয়েছেন তো । সামলে নেবেন :-)"


রিয়া চুপ করে গেলো । তার মুখে এক প্রশান্ত হাসি । এবারেও স্বপ্নময় তা দেখতে পেলো না । রিয়ার মন জুড়ে স্বপ্নময় স্বর্গের আবেশ, কোটি কোটি পারিজাত তাতে প্রস্ফুটিত । রিয়া ক্রমশঃ অবচেতনের গহীনে তলিয়ে যেতে লাগলো । হাত পা অবশ হয়ে এলো । ললিতা রান্না ঘরে ছিল । কি একটা শব্দ পেয়ে দৌড়ে এসে রিয়ার অচেতন দেহ দেখতে পেলো


রিয়া এবার চোখ খুলেছে । সে হাসপাতালের বেডে । নার্স পাশেই ছিল, বললো


"আপনি অনেকদিন অজ্ঞান ছিলেন । ব্রিদিং ট্রাবল । করোনা টেস্ট হলো । নেগেটিভ ।"


রিয়ার কিছু মনে নেই । শরীর খুব দুর্বল ।


ডাক্তার এলেন । ডঃ মুখার্জী । সিনিয়র সার্জন । রিয়ার প্রিয় মাস্টারমশাই । এনার অনুরোধেই রিয়া কোভিড ওয়ার্ড-এ আসে । ডঃ মুখার্জী রিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন


"ওভার ওয়ার্ক হয়ে গেছে মা । বাড়ি গিয়ে রেস্ট নাও । অনেক ধকল গেছে । "


রিয়ার বাবা এসে নিয়ে গেলেন রিয়া কে । রাস্তায় যেতে যেতে বললেন


"উফ ! কেন মা জেদ করে গেলি বল ! তোর কিছু হয়ে গেলে ?"


রিয়া চুপ করে মাথা নিচু করে রইলো । বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন


"ও হ্যাঁ । স্বপ্নময়ের মায়ের সাথে কথা হলো । "


নামটা শুনেই রিয়ার মনে সেই পরিচিত সুবাস আবার অনুভূত হলো । সে বিষ্ফারিত চোখে বাবার দিকে চাইলো । বাবা মেয়ের মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে বললেন


"এ এক অদ্ভুত যোগাযোগ জানিস । স্বপ্নময় রুকুর স্কুল ফ্রেন্ড । ফেসবুক এ কথা বলতে বলতে বেরিয়ে পরে তুই রুকুর বোন । তুই দাদাকে বলেছিলিস অম্লানের ছেলেকে তুই বিয়ে করতে চাসনা ?"


রিয়ার মাথা নিচু হয়ে গেলো ।


"আমিও ঠিক চাইছিলাম না জানিস । কিন্তু ওই তো জানিস আমার স্বভাব, মুখের ওপর না বলতে পারি না"


রিয়ার মুখে প্রশান্ত হাসি ফুটে উঠেছে ।


"ছেলেবেলার বন্ধু তো ..যাগগে ! রুকুর মাধ্যমে স্বপ্নময় ও ওর মা তোর ব্যাপারে আরও জেনেছে । উনিও স্বপ্নময়ের জন্যে পাত্রী দেখছিলেন ..আমিও জানলাম ওর ব্যাপারে।...হীরের টুকরো ছেলে ! আই.আই.টি খড়গপুরে ফ্যাকাল্টি পসিশন পেয়েছে জানিস! ও জয়েন করতেই ফিরেছিল আমেরিকা থেকে । "


রিয়ার মনে অমরাবতীর ঢেউ উথাল পাথাল করছে । সে বাবার হাত ধরে বাবার কাঁধে মাথা রেখেছে । খুব আনন্দ হলে সে তাই করে ।


বাড়ি ফিরে রিয়া হোয়াটসাপে টোন শুনে খুলে দেখে স্বপ্নময়


"কি ডোনেশন এর কি হলো ? :-)"


রিয়া উত্তরে স্মাইলি দিলো


"এই জন্যেই তো আমার নম্বর চেয়েছিলেন? নাকি?"


রিয়া চুপ করে রইলো । লজ্জায় অনুরাগে সে আবিষ্ট । অনেক কষ্টে সামলে নিয়ে লিখলো


"শুনলাম আপনি আই.আই.টি তে ফ্যাকাল্টি পসিশন পেয়েছেন । কৈ একবারের জন্যেও তো বলেননি আমায় !"


স্বপ্নময় লিখলো


":-) ওসব ছাড়ুন ...আপনাকে তো দেখতে গেছিলাম হাসপাতালে । আপনি সেন্সলেস ছিলেন । আমায় ললিতা বললো। মা কে বলি, মা তো কান্না কাটি করে একশা । যাক তারপর রুকুর থেকে জানলাম আপনি ওর বোন । এদিকে মায়ের নাকি আপনাকে ভারি পছন্দ ! হোয়াটস্যাপ, ফেসবুকে আপনার ছবি দেখে, আপনার কথা শুনে । আমি বললাম -- বোঝো কান্ড! এদিকে রুকুও বলে -- তুই ছিলি কোথায় ভাই! এদিকে আমার বোনটা তো অপাত্রে দান হয়ে যাচ্ছিলো :-) :-)

কি হলো? আছেন তো?"


রিয়া তখন যেন স্বপ্নাচ্ছন্ন । স্বপ্নময়ের প্রশ্নে সম্বিৎ ফিরলো । লিখলো

"হ্যাঁ "


"যাক ! রুকু আর আমার মা মিলে তো সেমিফাইনাল করে ফেলাইছে । কিন্তু ফাইনাল রাউন্ডটা বাকি, বুঝলেন তো ।"


রিয়া অবাক হয়ে লিখলো


"মানে?"


"মানে পাত্র পাত্রীর মত তো চাই নাকি ?? :-)"


রিয়া এতক্ষণে লজ্জায় আরক্ত হয়ে গেছে । অনেক কষ্টে একটা স্মাইলি দিলো । স্বপ্নময় বললো


"মানে শুধু আপনার মত পাওয়াই বাকি আর কি :-)"


রিয়ার দেহে মনে সেই সুবাস হিল্লোলিত । এবার সে জ্ঞান হারাবে না । কিন্তু সে কি হারিয়েছে তা সে প্রথম দিন থেকেই জানে ।